সরকারের প্রথম বাজেটেই জাতি চরমভাবে হতাশ হয়েছে : জামায়াত
আপলোড সময় :
১১-০৬-২০২৬ ০৯:৪১:২৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-০৬-২০২৬ ০৯:৪১:২৬ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
তোফােয়েল আহমেদ, নিজস্ব প্রতিনিধি: জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘বিশাল ঘাটতি ও ঋণের গতানুগতিক বাজেট’ বলে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, বর্তমান সরকারের প্রথম এই বাজেটে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের’ প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা ও ভাবনার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি, যা দেশবাসীকে চরমভাবে হতাশ করেছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এক বিবৃতিতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ নতুন এই বাজেট নিয়ে দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের কঠোর সমালোচনা করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটেই জাতি চরমভাবে হতাশ হয়েছে। এই বাজেটে নীতিগত কোনো সংস্কার প্রস্তাব নেই, এটি সম্পূর্ণ একটি গতানুগতিক বাজেট। এত বড় বাজেটের বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মোট বাজেটের ৭০ ভাগই পরিচালন ব্যয় (চলতি খরচ) হিসেবে ধরা হয়েছে। অনুৎপাদনশীল খাতে এত বিশাল বরাদ্দ সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
উল্লেখ্য, এর আগে দুপুরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গঠিত তারেক রহমান সরকারের এটিই প্রথম সংসদীয় বাজেট। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে এই বাজেট অনুমোদন দেয়া হয় এবং পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অর্থবিলে স্বাক্ষর করেন।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ঘোষিত এবারের বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাসহ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিগত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই বিশাল ঋণের ও ঘাটতির বাজেট সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এই বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট : এনসিপি
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের ৫৫তম বাজেট আর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট এটি। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত এই বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তবে বিএনপি সরকারের এই বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির ছায়া বাজেট কমিটির (এনসিপি) প্রধান ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ।
দলটির পক্ষ থেকে বাজেট সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে আতিক মুজাহিদ বলেন, এটি একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও বাস্তবতা-বিবর্জিত বাজেট। সরকার প্রায় ২.৫ লাখ কোটি টাকার ঘাটতির কথা বললেও বাস্তবে ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে ৪.৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
এনসিপির এই সংসদ সদস্য বলেন, প্রস্তাবিত ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অর্জন করা অসম্ভব। আমার ধারণা, রাজস্ব আদায়ে ২ লাখ কোটিরও বেশি ঘাটতি থেকে যেতে পারে। প্রকৃত হিসাব বিবেচনায় এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ব্যবসাবান্ধব বাজেট, কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি: ঢাকা চেম্বার সভাপতি
সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত সংস্কারের পূর্ণ বাস্তবায়নের উপরই এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের উপর ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তাৎক্ষণিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়ানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভরতা ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের জন্য খুব ইতিবাচক নয়। তবে পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক। এছাড়া ৩ লাখ কোটি টাকার নতুন এডিপি গত বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি হলেও চলতি অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ হওয়ায় এটি বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। তাই শুধু বড় বাজেট বা বড় এডিপি নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে। শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, ৬০টি নিত্যপণ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর নির্ধারণ, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা এবং স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে কর ছাড়ের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এছাড়া ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ত্রৈমাসিক অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন চালুর সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে ডিসিসিআই।
তবে মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা এবং সর্বোচ্চ আয়কর হার ৩৫ শতাংশ নির্ধারণ করায় হতাশা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার দাবি জানিয়েছে তারা। ক্যাশলেস লেনদেন উৎসাহিত করতে পিওএস মেশিন আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং অগ্রিম কর শূন্য করার সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দকে সাধুবাদ জানিয়েছে ডিসিসিআই। এছাড়া এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখা, পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ই-লোন চালুর উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে টার্নওভার কর এবং আলাদা ভ্যাট রিটার্ন ফরম চালু হলে কর ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে বলেও মনে করে সংগঠনটি।
ডিসিসিআই মনে করে, বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে কর কমানোর ফলে দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। এছাড়া স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ অতিরিক্ত ভ্যাট এবং সম্পূর্ণ শুল্ক অব্যাহতি, পাশাপাশি দেশীয় ই-বাইক উৎপাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সব ধরনের রেয়াতি সুবিধা বহাল রাখার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে তারা।
সংগঠনটি আরও বলেছে, ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ক্ষেত্রে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি, নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর কমানো এবং চার্জিং নেটওয়ার্ক আমদানিতে কর শূন্য করার সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী উদ্যোগ। তবে গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন কূপ খননের পরিকল্পনা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো না থাকলে স্বল্পমেয়াদি ভর্তুকি বিনিয়োগ বাড়ানোর বদলে অপচয় বাড়াতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মূল্য কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।
বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে বাজেটে সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, ওয়ার্ক পারমিট ৭ দিনের মধ্যে দেয়ার উদ্যোগ, বিদেশি ঋণের সুদের ওপর উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা এবং উৎসে কর কর্তনের কারণে ব্যয় অগ্রহণযোগ্য ঘোষণার বিধান বাতিলের মতো পদক্ষেপ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে ডিসিসিআই।
এ সময় ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Bangla Release 24
কমেন্ট বক্স